২৯ বছর শিক্ষকতা শেষে হেলাল উদ্দিন স্যারকে রাজকীয় বিদায়
মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম, কুলাউড়া প্রতিনিধি:
২৯ বছর যে বিদ্যালয়কে ঘিরে ছিল তাঁর জীবন, সেই প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন হেলাল উদ্দিন স্যার। ফুল, সম্মাননা, উপহার, ব্যান্ড পার্টি আর রাজকীয় গাড়ির আয়োজনে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানালেন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। বিদায়ের শেষ মুহূর্তে ১৯৯৯ সালের এসএসসি ব্যাচের পক্ষ থেকে গাড়িতে করে তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয় নিজ বাড়িতে।
দীর্ঘ ২৯ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে আবেগঘন ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিদায় জানানো হয়েছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার রাউৎগাঁও ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী রাউৎগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ হেলাল উদ্দিন স্যারকে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সকাল ১১টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে তাঁর অবসরজনিত বিদায় উপলক্ষে বিশেষ বিদায় সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
রাউৎগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান খয়াজের সভাপতিত্বে এবং রাউৎগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিত চৌধুরী রিপনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা শিক্ষা অফিসার মো. ফজলুর রহমান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এম এ মুহিত, লংলা আধুনিক ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজমুল ইসলাম, নবীনচন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমির হোসেন, বরমচাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. ফজলুল হক, রাউৎগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জাকারিয়া, শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নওসাদ আলম, কুলাউড়া অ্যাসোসিয়েশন অব ইউএসএ ইনকের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাবেদ আহমেদসহ অনেকে।
এছাড়াও রাউৎগাঁও এলাকার বিশিষ্ট মুরব্বি মাসুক উদ্দিন চৌধুরী, হাসনু মিয়া, মতিউর রহমান মতি, ৮ নম্বর রাউৎগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য আরিফুল ইসলাম বেলাল, বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য আবুল কালাম রেন্জু, সাবেক অভিভাবক সদস্য ওয়াহিদুজ্জামান শহিদ, আব্দুল হাকিম, ডা. ফারুকীসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো শুধু শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক হয়ে থাকেন না; তিনি শিক্ষার্থীদের জীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন। হেলাল উদ্দিন স্যার দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর অবসর একটি কর্মজীবনের সমাপ্তি হলেও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান কখনো শেষ হবে না।।
বক্তারা আরও বলেন, হেলাল উদ্দিন স্যারের মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের বিদায় শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বিদায় নয়, বরং তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার একটি সুযোগ। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের সাফল্যের পেছনে স্যারের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার অবদান রয়েছে।
বিদায়ী শিক্ষক হেলাল উদ্দিন স্যারকে ঘিরে বক্তারা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা করে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসীর হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয় বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রিয় শিক্ষকের বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নেওয়া হয় নানা আয়োজন। ফুল, সম্মাননা ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী দিয়ে তাঁকে বিদায় জানানো হয়। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে হেলাল উদ্দিন স্যারকে নগদ ১ লাখ টাকা সম্মাননা প্রদান করা হয়।
পাশাপাশি ১৯৯৯ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ফ্রান্স প্রবাসী জামাল হোসেন ইমান এবং তাঁর ব্যাচের পক্ষ থেকে ৪০ হাজার টাকা সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া ব্যান্ড পার্টি, সম্মাননা স্মারক, বিশেষ মধ্যাহ্নভোজ এবং রাজকীয় গাড়িতে আনা-নেওয়ার আয়োজন করা হয়।
বিদায়ী আয়োজনে উপস্থিত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকেই দীর্ঘদিন পর প্রিয় শিক্ষককে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ স্মরণ করেন বিদ্যালয়ের পুরোনো দিনের কথা, কেউ আবার স্যারের স্নেহ-শাসনের স্মৃতি তুলে ধরেন। সব মিলিয়ে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
বিশেষ করে বিদায়ের শেষ মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। দীর্ঘদিনের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের স্মৃতি বুকে ধারণ করে প্রিয় শিক্ষককে রাজকীয় গাড়িতে তুলে দেন শিক্ষার্থী সহ সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষীরা। পরে গাড়িতে করে তাঁকে নিজ বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে ছিল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বিদায়ের আবেগ।
২৯ বছর আগে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে পথচলা শুরু করেছিলেন, দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে সেই বিদ্যালয় থেকেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় বিদায় নিলেন হেলাল উদ্দিন স্যার। তাঁর শিক্ষকতা জীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থী জ্ঞান, শিক্ষা ও নৈতিকতার আলো পেয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও পথপ্রদর্শক।
একজন শিক্ষকের বিদায়কে কেন্দ্র করে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এমন ভালোবাসা ও সম্মানের প্রকাশ অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। নগদ সম্মাননা, উপহারসামগ্রী, ব্যান্ড পার্টি, রাজকীয় গাড়ি এবং গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে হেলাল উদ্দিন স্যারের প্রতি শিক্ষার্থীদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
দীর্ঘ ২৯ বছরের কর্মময় শিক্ষকতা জীবনের শেষে হেলাল উদ্দিন স্যারের এই বিদায় তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক বিদায় হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে একজন প্রিয় শিক্ষকের প্রতি তাঁর প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানানোর এক স্মরণীয় আয়োজন।