সাইকেলে খবরের বান্ডিল, কিশোরগঞ্জের পথে পথে ২৫ বছর যাবত পত্রিকা বিলি করছে হকার সুমন
কিশোরগঞ্জ ও নিকলী প্রতিনিধি:
ঝড়-বৃষ্টি, তাপদাহ, শৈত্যপ্রবাহ, সিডর-আইলার মতো দুর্যোগ, এমনকি ১০৪ ডিগ্রি জ্বরও থামাতে পারেনি তাঁকে। টানা ২৫ বছর ধরে প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র পাঠকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার একমাত্র পত্রিকা বিক্রেতা সুমন মিয়া। সংবাদপত্রের ছুটির দিন ছাড়া এই দীর্ঘ সময়ে এক দিনের জন্যও দায়িত্বে বিরতি নেননি এই মানুষটি। প্রতিদিন একটি সাইকেলে করে এক গুচ্ছ সংবাদপত্র নিয়েই কেটে গেছে ২৫ বছরের কর্মজীন।
সাইকেলের পেছনে পত্রিকার বান্ডিল। এক হাতে দিনের পত্রিকা, অন্য হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল। নিকলী উপজেলা শহরের বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, দোকানপাট ও রাস্তার পাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন এভাবেই ঘুরে বেড়ান তিনি। তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন—সংবাদপত্র বিক্রি।বলছিলাম কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার একমাত্র পত্রিকার হকার সুমন মিয়ার কথা।যিনি দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত পত্রিকা বিলি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।তিনি নিকলী উপজেলার পুকুরপাড় এলাকার বাসীন্দা।
সকাল হলেই শুরু হয় তাঁর কর্মব্যস্ততা। দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র সংগ্রহ করে সাইকেলে সাজিয়ে বেরিয়ে পড়েন নিকলীর পথে। কোথাও নিয়মিত পাঠকের হাতে তুলে দেন পত্রিকা, কোথাও আবার দোকান কিংবা সরকারি কার্যালয়ে পৌঁছে দেন দিনের সংবাদপত্র তথা খবরের কাগজ।
বয়স ও সময়ের সঙ্গে মানুষের খবর পড়ার ধরন বদলেছে। মুঠোফোনে এখন মুহূর্তেই দেশ-বিদেশের সংবাদ পাওয়া যায়। তবু ছাপা পত্রিকার প্রতি আগ্রহ রয়েছে অনেকের। আর সেই পাঠকের হাতে প্রতিদিন পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে যাচ্ছেন এই মানুষটি।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সাইকেল চালিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলাই তাঁর প্রতিদিনের রুটিন।রোদ বৃষ্টি ঝড় তুফান উপেক্ষা করে প্রতিদিন ভোরে জেলা শহরে গিয়ে পত্রিকা সংগ্রহ করে কটিয়াদি উপজেলার গচিহাটা থেকে শুরু করে নিকলী উপজেলা সদর ও নিকলী উপজেলার শেষ প্রান্ত দামপাড়া ও মজলিশপুর পর্যন্ত পত্রিকার বান্ডিল নিয়ে নিকলী উপজেলার ব্যস্ত সড়ক, অলিগলি ও বাজারের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর উপস্থিতি অনেকেরই চেনা।
পত্রিকা বিক্রি তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা নয়; এর ওপর নির্ভর করে তাঁর সংসারের আয়-ব্যয়। তাই প্রতিদিনের পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের স্বপ্ন ও প্রয়োজন।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও সংবাদপত্রের এই নেপথ্য কর্মীদের ভূমিকা কমেনি। পাঠকের হাতে একটি পত্রিকা পৌঁছে দিতে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেই পথের অন্যতম সঙ্গী এই সাইকেল। আর সাইকেলের সঙ্গে বাঁধা পত্রিকার বান্ডিল যেন তাঁর জীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
নিকলীর পথে পথে প্রতিদিন ছুটে চলা এই পত্রিকা হকার হয়তো নিজে কোনো খবরের শিরোনাম হন না। কিন্তু তাঁর হাত ধরেই প্রতিদিন অসংখ্য পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় দেশের নানা প্রান্তের খবর।
পত্রিকার হকার সুমন মিয়া বলেন, 'পত্রিকা বিলি করা আমার কাছে শুধু জীবিকা নয়, এটি দায়িত্বও। প্রতিদিন সকালে পাঠকরা পত্রিকার অপেক্ষায় থাকেন। তাই শরীর খারাপ হলেও দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াইনি।' তিনি জানান, ভোর ৬টায় বাড়ি থেকে একটি পুরোনো সাইকেল নিয়ে বের হন।জেলা সদর থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করে কটিয়াদি ও নিকলী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পাঠকের হাতে সংবাদপত্র পৌঁছে দেন তিনি।জাতীয় দৈনিকের পাশাপাশি স্থানীয়, সাপ্তাহিক ও আঞ্চলিক পত্রিকাও নিয়মিত বিতরণ করেন।
সময়ের পরিবর্তনে পত্রিকার দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে ছাপা পত্রিকার পাঠক। অনলাইন সংবাদমাধ্যমের বিস্তারে অনেক হকারই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।সুমন মিয়া এখনও আঁকড়ে আছেন তাঁর দুই দশকেরও বেশি সময়ের পুরোনো পেশা।
তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। বয়সও হয়েছে, শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না। তবুও যতদিন পারি, পাঠকের হাতে সংবাদপত্র পৌঁছে দিতে চাই।’
কিশোরগঞ্জের সংবাদপত্র পরিবেশক প্রতিষ্ঠান এর স্বত্বাধিকারী মোকাররম হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবত হকার সুমন এই পেশায় আছেন।দীর্ঘ প্রায় ২৫- ৩০ বছর যাবত থেকে দেখে আসছি, দায়িত্ব পালনে তিনি কতটা আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান।’
তিনি আরো বলেন ‘দীর্ঘ ২৫-৩০ বছর ধরে সংবাদপত্র পাঠকের দোরগোডায় পৌঁছে দিয়ে হকার সুমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সংবাদপত্র শিল্পের নীরব এই সৈনিকের অবদান নিঃসন্দেহে সম্মানের দাবিদার।’