তাড়াইলের দুই গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় ভোগান্তিতে কোমলমতি শিশুরা
রুহুল আমিন, তাড়াইল (কিশোরগঞ্জ):
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা ইউনিয়নের ইদিলপুর ও বান্দুলদিয়া গ্রামে নেই কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুই গ্রামের জনসংখ্যা ৪ হাজারের বেশি। ফলে প্রায় দুই শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে কুন্দ্রাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কার্তিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে।
তাড়াইল উপজেলায় মোট ৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে এসব বিদ্যালয়ের কোনোটিই ইদিলপুর ও বান্দুলিয়া গ্রামের শিশুদের জন্য কাছাকাছি নয়। দীর্ঘদিন ধরে দুই গ্রামে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন কোমলমতি শিশুদের দীর্ঘ পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এ সময় কাদামাখা সড়ক মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। অনেক সময় তারা বিদ্যালয়ে সময়মতো পৌঁছাতে পারে না। ফলে বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও কমে যায়।
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্বের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বাড়ির কাছাকাছি গড়ে ওঠা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কয়েকজন অভিভাবক জানান, কিন্ডারগার্টেনে পড়াতে মাসিক বেতনসহ বিভিন্ন খরচ বহন করতে হয়। এতে পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বান্দুলদিয়া গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ হাজী রমজান আলী বলেন, জীবন সায়াহ্নে এসে এখনও স্বপ্ন দেখি, এই গ্রামে একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন আর কষ্ট করে দূরের স্কুলে যেতে না হয়। আমরা অনেক বছর ধরে এই দাবি করে আসছি। জীবিত থাকা অবস্থায় যদি এই গ্রামের শিশুদের জন্য একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেখে যেতে পারি, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নতুন নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর পক্ষে ইদিলপুর গ্রামের আবদুল কদ্দুস ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদন করেন। ওই আবেদনের অনুলিপি তৎকালীন জেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছেও জমা দেওয়া হয়।
একই দাবিতে ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর এলাকাবাসীর পক্ষে বান্দুলিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ক্যাডেট কলেজ কর্মকর্তা শাহ আবুল হাশেম (মানিক) ঢাকার শিশু কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক বরাবর আবেদন করেন। ওই আবেদনের অনুলিপি তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টাজেলা প্রশাসক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আবেদনের পরও সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত তাঁরা কার্যকর কোনো সাড়া পাননি।
ইদিলপুর গ্রামের বাসিন্দা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক সাদিকুল ইসলাম নিয়োগী পন্নী বলেন, আমাদের দুই গ্রামের শিশুদের দীর্ঘদিন ধরে দূরের বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। বর্ষাকালে কাদা রাস্তা পেরিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে এলাকার শিশুদের শিক্ষার সুযোগ আরও সহজ হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, আমিও স্বীকার করি, ইদিলপুর ও বান্দুলদিয়া—এই দুটি গ্রামের মাঝামাঝি একটি বিদ্যালয় থাকা দরকার। কিন্তু এই মুহূর্তে সরকারিভাবে নতুন করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। তবে নতুন করে কিন্ডারগার্টেন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমার যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন আমি করব।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দুই গ্রামের ৪ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস এবং প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগ না থাকলে অন্তত একটি মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চান তাঁরা।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা,বছরের পর বছর আবেদন-নিবেদনের পর এবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। আর হাজী রমজান আলীর মতো প্রবীণদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রূপ নেবে।