খুলনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস পালিত
মো: আল-মাহফুজ শাওন :
‘জুলাই চেতনায়, গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খুলনায় যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস পালিত হয়েছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) দিবসটি উপলক্ষে সকালে নগরীর শিববাড়ি মোড়ে জুলাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সূচনা হয়। জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য ও জুলাই যোদ্ধারা ছাড়াও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ও মহানগর ইউনিট, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী, বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুন, রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান, কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, কেডিএ চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম, ওয়াসার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, পুলিশ সুপারসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পরে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া নগরীর বসুপাড়া কবরস্থানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ শেখ মো. সাকিব রায়হানের কবর জিয়ারত করা হয়।
শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা
দিবসটি উপলক্ষে খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য, আহত ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল্লাহ হারুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী। স্বাগত বক্তব্য দেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এস কে আজিজুল বারী বলেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া যোদ্ধারা ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের মাধ্যমে দেশকে গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে নেওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। বৈষম্যহীন, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে তারা গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, যুবসমাজ জাতি গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাদের ইতিবাচক ভূমিকার মাধ্যমে দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, কোনো বিষয়ে অভিযোগ থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা হবে। তবে কেউ অন্যায় বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহির ব্যবস্থা করা হবে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান, রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও ওয়াসার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। এ সময় শহিদ শেখ মো. সাকিব রায়হানের বাবা শেখ আজিজুর রহমান, মাথা নূরনাহার, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও নিহত পরিবারের সদস্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নগরজুড়ে আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জুলাই আন্দোলনের ওপর বস্তুনিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক দুর্লভ আলোকচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
শিববাড়ি মোড়, শহিদ হাদিস পার্ক, ময়লাপোতা মোড়, জোড়াগেট, গল্লামারী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা, রূপসা মোড়, নতুন রাস্তা এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মিনিপোলে এসব প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
বাদ জোহর নগরীর মসজিদগুলোতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহিদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে শহিদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে কেসিসির নানা আয়োজন
খুলনা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস, চেতনা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রত্যাশা নিয়ে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
এছাড়া খুলনা আঞ্চলিক তথ্য অফিসের উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
প্রীতি ফুটবল ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
দিবসটির কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিকেলে খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি শহিদ হাদিস পার্ক ও শিববাড়ি মোড়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে সরবরাহকৃত চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। সরকারি-বেসরকারি বিনোদনমূলক স্থানগুলোও শিশুদের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং বিনা টিকিটে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।
দুপুরে জেলার সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, শিশু পরিবার, শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার, শিশু বিকাশ কেন্দ্র ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়।
পতাকা ও ব্যানারে সজ্জিত নগর
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী খুলনা নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকা, বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন নিশানায় সজ্জিত করা হয়। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে করা হয় আলোকসজ্জা ও গ্রাফিতি অঙ্কন।
জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও দিবসটি উপলক্ষে রচনা, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
উপজেলাতেও পালিত নানা কর্মসূচি
খুলনা জেলার উপজেলাগুলোতেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে অনুরূপ কর্মসূচি পালন করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহিদদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, দোয়া ও প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বিভিন্ন কর্মসূচিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দিনব্যাপী এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহিদদের স্মরণ, আহত ও আন্দোলনকারীদের সম্মান জানানো এবং বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।