বনজীবীদের মৌসুমি আয়ের উৎস সুন্দরবনের কেওড়া ফল
উপজেলা প্রতিনিধি (খুলনা) :
বর্ষা এলেই সুন্দরবনের নদী-খালবেষ্টিত বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। সবুজ কেওড়া গাছগুলোতে ধরে থোকা থোকা ফল। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেওড়াফল সংগ্রহের মৌসুমে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিরা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করেন। মাছ, মধু ও গোলপাতার পাশাপাশি কেওড়াফল সংগ্রহও এ সময় বননির্ভর বহু পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি আয়ের উৎস হয়ে ওঠে।
সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলের কয়রা, শ্যামনগর, দাকোপ ও মোংলাসংলগ্ন বনাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি কেওড়া গাছ দেখা যায়। প্রতিদিন ভোরে সংগ্রহকারীরা নৌকাযোগে বনাঞ্চলে প্রবেশ করে গাছ থেকে পাকা ফল সংগ্রহ করেন। বিকেলের মধ্যে তারা স্থানীয় বাজারে ফিরে আসেন। পরে এসব ফল কয়রা, শ্যামনগর, মোংলা, দাকোপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কেওড়াফল শুধু বাজারজাত করার জন্য নয়, পারিবারিক খাদ্য হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়। টক-মিষ্টি স্বাদের এ ফল দিয়ে আচার, ভর্তা, চাটনি, জেলি ও শরবত তৈরি করা হয়। অনেক পরিবার পুরো মৌসুমজুড়ে নিয়মিত কেওড়াফল খেয়ে থাকে। শিশুদের কাছেও ফলটি বেশ প্রিয়।
কয়রার কয়েকজন ফল বিক্রেতা জানান, মৌসুমের শুরুতে কেওড়াফলের চাহিদা ও দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। পরে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমে আসে। তবে পুরো মৌসুমে ফল বিক্রি করে অনেক বননির্ভর পরিবার বাড়তি আয় করতে সক্ষম হয়।
উদ্ভিদবিদদের মতে, কেওড়াফল পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে ভিটামিন-সি, খাদ্যআঁশ, খনিজ লবণ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ফলে এটি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং স্বাস্থ্যকর মৌসুমি ফল হিসেবে পরিচিত।
তবে কেওড়া গাছের গুরুত্ব শুধু ফল উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ। নদী ও খালের তীরের মাটি দৃঢ়ভাবে ধরে রেখে ভাঙন কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেওড়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিত্রা হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী কেওড়ার পাতা ও ফল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে কেওড়া গাছের সংখ্যা কমে গেলে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অবৈধভাবে গাছ কাটার কারণে সুন্দরবনের কেওড়া বনও হুমকির মুখে রয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, কেওড়া গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম নিশ্চিত করা, নতুন করে বনায়ন এবং বনজ সম্পদ আহরণে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেওড়াফল শুধু একটি মৌসুমি বনজ ফল নয়; এটি উপকূলীয় মানুষের খাদ্য ও আয়ের উৎস, সুন্দরবনের বন্য প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য এবং উপকূলীয় পরিবেশ সুরক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক উপাদান। তাই কেওড়া গাছ সংরক্ষণ করা মানে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং উপকূলীয় মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা।