ভাড়াটে খুনিদের হাতে খুন হন বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম, চাপাতিসহ আটক ঢাকার তিন খুনি
আশরাফুল ইসলাম তুষার,কিশোরগঞ্জ:
ঢাকা থেকে আসা ভাড়াটে খুনিদের হাতে খুন হয়েছেন কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে মিঠামইন উপজেলা সদরের বেড়িবাঁধে নিজ বাড়ির সামনেই চাপাতি হাতে ওঁৎ পেতে থাকা খুনিরা বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে নৃশংসভাবে কোপায়।
ঘটনাস্থল থেকে চাপাতিসহ হেলাল (২৮) নামের এক দুর্বৃত্তকে জাপটে ধরে ফেলেন ঘটনার সময় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে থাকা বিএনপির কর্মী হাদিস মিয়া।এ সময় খুনিদের কোপে তিনি নিজেও গুরুতরভাবে আহত হন।
রাতেই করিমগঞ্জের বালিখোলা থেকে আরো দুই সন্দেহভাজন হত্যাকারীকে আটক করে পুলিশ।
সূত্রমতে, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে খুনিরা হাওর পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মিঠামইন উপজেলা বিএনপির অফিসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে রাত সাড়ে ৯টার দিকে জাহাঙ্গীর বিএনপির কর্মী হাদিস মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন।
মিঠামইন উপজেলা সদরের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে যাওয়ামাত্র দুর্বৃত্তরা জাহাঙ্গীরের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়।খুনিরা চাপাতি দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
এসময় তার সঙ্গে থাকা বিএনপি কর্মী হাদিস মিয়াকেও কুপিয়ে আহত করা হয়। আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও হাদিস মিয়া ভাড়াটে খুনি হেলালকে জাপটে ধরে ফেলেন।
পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক বিএনপি নেতা জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সহকারী সার্জন ডা. আনন্দ বসাক জানান, গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ১১টায় জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীরকে মৃত অবস্থায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য নিহতের মরদেহ কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এ ঘটনায় গুরুতর আহত হাদিস মিয়াকে একই হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।নিহত জাহাঙ্গীরের মাথায় জখমের চিহ্ন রয়েছে।কুপিয়ে তার দুই হাতও প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান রাতেই হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে জেলা পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে একজন সহ মোট তিনজনকে গ্রেফতার করে।
এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-বরগুনা জেলার বামনা থানার চালিতাবুনিয়া গ্রামের মৃত সুলতানের ছেলে মো. হেলাল (২৫), লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার নাগমুদ বাজার দুধরাজপুর গ্রামের মো. নূর হোসেনের ছেলে মো. মহিন উদ্দিন (৩২) ও লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার নাগমুদ বাজার মধ্যপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহ ওরফে খোকনের ছেলে মো. শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।তারা বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ দাবি করেছে, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা ভাড়াটে অপরাধী চক্রের সদস্য। তবে হত্যার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২ টায় জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান। কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান,'ঢাকা থেকে আসা ভাড়াটে খুনিরা এ হত্যকাণ্ড ঘটায়।আটক তিনজনের মধ্যে চাপাতিসহ ঘটনাস্থল থেকে হেলালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক বাকি দুজনেরও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে।'
তিনি আরো বলেন“অপরাধী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।”
এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকল কলেজ হাসপাতালে নিহত মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর এর মরদেহ দেখতে আসেন কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা এড.ফজলুর রহমান।পরে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে যান তিনি।এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
এ সময় তিনি মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেন,আমি একটা কথা আমি বলতে চাই, আজকে বলতে পারি আমার সন্তান, সে আমার সন্তানের মত ছিল। সে একজন হতভাগা রাজনৈতিক কর্মী, নেতা। মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিল। জীবন-যৌবন সবকিছু রাজনীতির জন্য গিয়ে দিয়েছে। গত ১৫ বছর হাসিনা স্বৈরাচারী সরকার এবং এলাকার সেই ফ্যাসিস্ট হামিদ, আব্দুল হামিদ শক্তির বিরুদ্ধে সে টোটাল ফাইট করে গিয়েছে। একদিনের জন্যও মাথা নত করে নাই।
তিনি বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় এসব কথা বলেন।
ফজলুর রহমান আরও বলেন, সেই জাহাঙ্গীর, যে জাহাঙ্গীর অনেকেই চলে গিয়েছিল কিন্তু মিঠামইন সদরে থেকেও সে মাথা উঁচু করে শহীদ জিয়ার রাজনীতি, তারেক জিয়ার নেতৃত্ব, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে মেনে রাজনীতি করেছে। একটা পর্যায়ে কেন জানি সে একটা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে গেল। কথাটা আমি কেন্দ্রকে বললাম যে সে হলো ষড়যন্ত্রের শিকার। সে কোনো কোনো ধরনের অন্যায় করে নাই, গাছ সে কাটে নাই। এটা ভিন্ন বিষয়, এটা দেখা যাবে মামলা এবং আদালতে।
তিনি আরও বলেন, কিন্তু আজকে, আমি বলছি সেই জাহাঙ্গীর সর্বক্ষণ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দলের কাজ করতো, আমার সঙ্গে কাজ করতো। আজকে মিঠামইন থানার ঢাকিতে আমার ডাকাতি বিরোধী একটা প্রতিরোধ সমাবেশ ছিল। সেখানে জাহাঙ্গীরের সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। সেই অবস্থায় আমিও আজকে মিঠামইনেই যাওয়ার কথা ছিল ঢাকিতে। কিন্তু আল্লাহ তাকে নিয়ে গেছে। ষড়যন্ত্র করে, আমি ভাবতেই পারি না, এটা আমার ভাবনার অধিক যে কিভাবে হাওর অঞ্চলের মত একটা শান্ত এলাকাতে, এক নির্জন, নিভৃত এলাকায়—যে হাওর অঞ্চলকে বলা হয় শান্তির নীড়, সেইখানে ঢাকা থেকে এসে একদল লোক তাকে কিভাবে হত্যা করল!
ফজলুর রহমান আরও বলেন, যদিও আজকে আমি শান্ত মনে বলবো না, আমি আমার অশান্ত মনেই বলছি, আমি একটা ব্যাপারে পুলিশকে ধন্যবাদ দিব—এদেরকে ধরতে তারা সমর্থ হয়েছে। এখন পুলিশ এবং আসামি বা অপরাধীদের বক্তব্য এবং তাদের কর্মকাণ্ড এবং তাদের ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে বুঝা যাবে কারা হত্যা করেছে, কারা হত্যার পিছনে ছিল, কারা হত্যাকাণ্ডে মদদ দিয়েছে। এই কথাটা আমাকে দিয়ে আপনারা বলাতে পারবেন না কারণ আমি তো জানি না কে তাকে হত্যা করেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি বলব নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক জাহাঙ্গীরের হত্যাকাণ্ডের পিছনে কারা। তবে একটা কথা আমি বলতে চাই আপনাদেরকে, যত রাষ্ট্রপতি বলেন, ভগ্নিপতি বলেন, অমুক-তমুক যাই বলেন, জাহাঙ্গীরের মত একটা ছেলে মিঠামইনে আর জন্মগ্রহণ করবে বলে আমার মনে হয় না, তার মত একটা সাহসী ছেলে। আজকে তার জন্য আমি কালকে সারারাত ঘুমাতে পারি নাই। আমার আমার হৃদয়ের কান্না কোনদিন শেষ হবে না। তারপরও আমি বলতে চাই দেশের মানুষের কাছে, আমার দলের কাছে, আমি বলতে চাই আপনারা জিনিসটা ভালো করে লক্ষ্য করুক যাতে জাহাঙ্গীরের এই নির্মম এবং নিষ্ঠুর এবং এই চক্রান্তমূলক এবং ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়। যারা এর পিছনে আছে তাদেরকেই ধরেন, এটাই হলো আমার কথা।