শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

কক্সবাজার ও বান্দরবানের ১৪৫ গ্রাম প্লাবিত; পানিবন্দী লাখো মানুষ

অনলাইন ডেস্ক ০৮ July ২০২৬ · Wednesday · ০১:১৮ অপরাহ্ণ
কক্সবাজার ও বান্দরবানের ১৪৫ গ্রাম প্লাবিত; পানিবন্দী লাখো মানুষ

এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার:

প্রকৃতির বিরূপ আবহাওয়া চরম ভোগান্তিতে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দুই জেলা  কক্সবাজার ও বান্দরবান । সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত কয়েকদিন ধরে চলা অবিরাম ও অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এই অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত। কক্সবাজারের ৯টি উপজেলার অন্তত ৩৩টি ইউনিয়নের ১২৫ টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি ঈদগাঁও, উখিয়া  ও টেকনাফের বিস্তীর্ণ এলাকার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। সেন্টমার্টিনের সাথে নৌযোগাযোগ বন্ধ,মহেশখালী - কক্সবাজার ও কুতুবদিয়া - মগনামা সীট্রক চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। জনদূর্ভোগ দেখা দিয়েছে। 

এদিকে গত দুই দিনে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে দাড়িয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরেও সদরের ঝিলংজায় পাহাড়ধসে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে রেললাইনে পানি জমে থাকায় প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আটকে পড়েছে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে তিনটি ফ্লাইটের অবতরণ ব্যর্থ হয়েছে এবং ঝড়ের কারণে চট্রগ্রাম - মহাসড়কের ৭ টি পয়েন্টে সড়কের উপর দিয়ে পানি চলাচল করায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই অতি ভারী বর্ষণ আগামী আরও দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

টানা বর্ষণের কারণে কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা অঞ্চলগুলোতে প্রতিনিয়ত ট্র্যাজেডি নেমে আসছে। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের দরিয়ানগর বড়ছড়া এলাকায় ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা নাসিমা আক্তার (২৭) নামের এক গৃহবধূ মাটিচাপা পড়ে নিহত হন। এই ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন ও এক সন্তান গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর আগে গতকাল রোববার দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে আটজনই ছিলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এইদিকে পেকুয়ায় মাটির ঘর ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দিনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে।

অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া ও বঙ্গোপসাগর চরম উত্তাল থাকায় টেকনাফের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সব ধরনের নৌযান চলাচল টানা পাঁচ দিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় দ্বীপে দ্রুত খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকটের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই বৈরী পরিস্থিতির কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দুই এইচএসসি পরীক্ষার্থী গতকাল টেকনাফে এসে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। জেলা প্রশাসন তাদের পুনরায় পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জরুরি আবেদন পাঠিয়েছে এবং পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য কোস্টগার্ডের বিশেষ সহযোগিতা চেয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার  বিমানবন্দরের জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দর এলাকায় ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বওয়ার কারণে বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিপর্যয় ঘটছে।

এছাড় রেললাইনের ওপর বন্যার পানি জমে থাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর স্টেশনে আটকে রয়েছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে জানালীহাট স্টেশনের কাছে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে গেলে ট্রেনটি থামিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনটিকে পিছিয়ে ষোলশহর স্টেশনে এনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বান্দরবান জেলার লামা আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ১৭ টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।   ফায়ার সার্ভিস, বন বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মীরা দিনভর  চেষ্টা চালিয়ে পাহাড়ি  মাটি ও গাছ সড়কের  উপর পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তা অপসারণ করার করার কাজে ব্যস্ত রয়েছে।

কক্সবাজার  আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায়  রেকর্ড ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সকালের টানা বর্ষণের ফলে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি, লামার সাথে ৭ ঘন্টা যাত্রী ও মালামালবাহী যান চলাচল বন্ধ ছিল।পানি নেমে যাওয়ায় সন্ধ্যার দিকে সড়ক যোগাযোগ সচল হয়।

এদিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী, বিজিবি ক্যাম্প, বাজারঘাটা, সমিতি পাড়া, রূমালীর ছড়া,  বিমানবন্দর সড়ক ও টেকপাড়ার সড়কে হাটু পানিতে সয়লাব হয়। উখিয়া, টেকনাফ, রামু ঈদগাঁও,চকরিয়া, মাতামুহুরি,, বদরখালী সড়কও পেকুয়া মগনামা সড়ক বানের পানিতে ডুবে যায়।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, অতি বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে বড় ধরনের কোন দুর্যোগ দেখা দেয়নি কোথাও। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার জন্য পৃথক সেল গঠন করা হয়েছে। 

কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার জানান, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের আগেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়েছিল। দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল থেকেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উচ্ছেদ ও বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার জোরালো অভিযান শুরু হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পরিষদ প্রশাসক এটিএম নুরুল বশর জানান, বৃষ্টি সাময়িক কমলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও দুই দিন ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে। তাই পাহাড়ধসে আর কোনো প্রাণহানি যেন না ঘটে, সে জন্য প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। ইতিমধ্যে জেলাজুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিশো...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ১১:০৮ অপরাহ্ণ