মানবতার নীরব ফেরিওয়ালা: মশিউর রহমান
মো. রায়হান কবির:
রাত গভীর। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে দরকার এক ব্যাগ রক্ত। স্বজনদের উৎকণ্ঠার মাঝেই ভরসার নাম হয়ে ওঠেন এক তরুণ—মশিউর রহমান। কোনো পারিশ্রমিক বা প্রচারের আশায় নয়, কেবল একটি প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই তিনি ছুটে বেড়ান মানুষ থেকে মানুষের কাছে।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার নেহালপুর গ্রামের ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ বর্তমানে মনিরামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ মানবসেবী।
মশিউরের জীবন শুরু হয়েছে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। শৈশবেই হারিয়েছেন বাবাকে। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে অল্প বয়সেই। দিনমজুরের কাজ করে যেমন সংসার চালান, তেমনি নিজের পড়াশোনার খরচও জোগান। কিন্তু অভাব তার মানবিকতাকে থামাতে পারেনি।
২০১৯ সালে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সংগ্রহের কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর থেকে চার হাজারেরও বেশি রোগীর জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে রক্তের ব্যবস্থা করেছেন। পাশাপাশি নিজেও ২১ বার স্বেচ্ছায় রক্তদান করে মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
রক্তদানেই তার মানবিকতা সীমাবদ্ধ নয়। পথের ধারে পড়ে থাকা অসহায়, বেওয়ারিশ কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের পাশেও নীরবে দাঁড়ান তিনি। নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই চেষ্টা করেন মানুষের কষ্ট লাঘব করতে।
মশিউর রহমান বলেন, “আমি এই কাজ করি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। মানুষের উপকার করতে পারলে যে মানসিক শান্তি পাই, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার আকাশ বলেন, “মশিউর রহমান অনেকদিন ধরেই গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু রক্তের ব্যবস্থা নয়, এলাকার যেকোনো বিপদে সবার আগে ছুটে আসে। এমন নিঃস্বার্থ মানুষ খুব কমই দেখা যায়। আমরা চাই, রাষ্ট্র ও সমাজ এমন মানুষদের যথাযথ মূল্যায়ন করুক।”
তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। অনেক সময় রক্তদাতাদের যাতায়াত ব্যয়ও বহন করতে হয়েছে তাকে। কখনো অবহেলা, কখনো অপমান—সবকিছু সহ্য করেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার থেকে তিনি সরে আসেননি।
আজকের সমাজে যখন মানবিকতার সংকট নিয়ে নানা আলোচনা হয়, তখন মশিউর রহমানের মতো তরুণরা নীরবে প্রমাণ করছেন—মানুষের জন্য কাজ করতে বড় পরিচয় বা বিত্তের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি মানবিক হৃদয় এবং সেবার মানসিকতা।
এমন মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা শুধু রাষ্ট্রের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। কারণ একজন মশিউর রহমান শুধু একজন মানুষের জীবন বাঁচান না, তিনি মানবতার প্রতি মানুষের বিশ্বাসও বাঁচিয়ে রাখেন।
লেখক: মো. রায়হান কবির
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়