নাটোরে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত
নাটোর প্রতিনিধি:
‘বিশ্ব মাদক সমস্যা: বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনী প্রতিক্রিয়া’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নাটোরে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালন করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে শুক্রবার (২৬ জুন) বেলা ১১টায় জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, নাটোরের যৌথ আয়োজনে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, সচেতনতামূলক বক্তব্য এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
দিবসের কর্মসূচির শুরুতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। র্যালিতে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। হাতে ব্যানার, ফেস্টুন ও সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় এক আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার রহমান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রীফা রাওনাক নীতু, নাটোর জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিদর্শক খন্দকার নাজিম উদ্দীন, নাটোর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোঃ শহীদুল হক সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালকবৃন্দ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। মাদকের কারণে তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে, অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত প্রচারণা এবং সামাজিক প্রতিরোধ।
বক্তারা আরও বলেন, মাদকাসক্তি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে পরিবার। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মিশে, কী ধরনের অভ্যাস গড়ে তুলছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। বক্তারা মনে করেন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠাগারভিত্তিক কার্যক্রম এবং সৃজনশীল উদ্যোগ তরুণদের মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করতে হলে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। তিনি বলেন, “মাদক শুধু একজন ব্যবহারকারীকেই ধ্বংস করে না, এটি একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়, সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।” তিনি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা ও তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার রহমান বলেন, মাদক পাচার ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে মাদক নির্মূলে তথ্যভিত্তিক সহযোগিতা ও জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, “মাদকবিরোধী লড়াইয়ে পুলিশ একা সফল হতে পারে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে।”
সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান বলেন, মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হলেও এটি থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও পারিবারিক সহায়তা প্রয়োজন। তিনি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি মাদকাসক্তি প্রতিরোধে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রীফা রাওনাক নীতু বলেন, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে মাঠপর্যায়ে নজরদারি, সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি জানান, মাদকবিরোধী অভিযান, পরামর্শসেবা এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা বলেন, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নিয়মিত সেমিনার, বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা গেলে মাদকের বিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানের শেষে দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে অতিথিরা পুরস্কার বিতরণ করেন। এ সময় উপস্থিত অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মাদকবিরোধী সচেতনতা বৃদ্ধির এ ধরনের আয়োজনকে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন। তারা বলেন, নিয়মিত এমন কর্মসূচি আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা তৈরি হবে।
আয়োজকরা জানান, আন্তর্জাতিক এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। নাটোরে আয়োজিত এ কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী আন্দোলনকে আরও বেগবান করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন, সমাজ ও পরিবার একসঙ্গে কাজ করলে নাটোরসহ সারাদেশে মাদকমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।