অণুগল্প: বাদলা দিনের গল্প
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে লাইব্রেরির সাথে খুব ভালো সখ্য গড়ে উঠেছে আমার। এটা শুধু আমার জ্ঞানস্পৃহা মেটায় না, মনের খোরাকও জোগায়। ক্লাস শেষ করে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর যখন লাইব্রেরির দিকে এগোই, মনের মধ্যে অদ্ভুত এক সুখানুভূতি তৈরি হয়। মনে হয় যেন দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর প্রিয়জনের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি। আর যদি দিনটা হয় বৃষ্টিভেজা, তাহলে তো কথাই নেই!
আজকে আষাঢ়র প্রথম দিন। আকাশে মেঘ থমথম করছে। জামান স্যারের ক্লাস চলছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টির আগ মুহূর্তের পরিবেশটা চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। এমন বাদলা দিনে কি আর ক্লাসে মনোযোগ থাকে? প্রথমবারের মতো হাজিরা টা মিস করলাম, সাথে স্যারের বকুনিও খেলাম। ক্লাস শেষ হতে না হতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ব্যাগ থেকে ছাতাটা বের করে বেরিয়ে পড়লাম। ৩৫ টাকায় ক্যান্টিনের খিচুড়ি দিয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। ছাতা খুলে রওনা দিলাম লাইব্রেরির দিকে। ছাতাটা সাথে থাকলে মনে হয় যেন পাশে কেউ হাঁটছে। এ এক অদ্ভুত স্বস্তি। অনেকদিন পর ভেজা মাটির নোনা গন্ধ মুহূর্তেই প্রাণটা জুড়িয়ে দিলো। লেকের কাছাকাছি যেতেই কানে ভেসে এলো ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাক। সেখানে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে দাড়িয়ে তাদের উৎসব দেখলাম। মিলনায়তনের কাছে একটা কদম গাছ আছে। কাছে গিয়ে দেখি, কদম ফুলে ছেয়ে গেছে গাছটা। ভবনের কার্ণিশে বসে একটা কাক নীরবে বৃষ্টিতে ভিজছে দেখে অদ্ভুত লাগলো। কাকটার কি কোনো বাসা নেই? বারান্দায় আশ্রয় নিলেও তো পারতো। হয়তো তার সংসারে অনেক অশান্তি চলছে, সঙ্গীর সাথে অভিমান করেছে, কিংবা প্রকৃতির কাছে প্রকাশ করছে নীরব আর্তনাদ। ওদিকে ফুটবল মাঠে একজোড়া শালিক পাখি মহা আনন্দে নেচে নেচে গোসল করছে। আসলেই, কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। কিন্তু, এটা আষাঢ় মাস। বৃষ্টি যেন থামছেই না, সমান তালে পড়ছে। আমারও থামলে চলবে না, এগিয়ে গেলাম আম বাগানের দিকে। যাক, রাফেল মামার দোকানটা অন্তত খোলা আছে। অনেকক্ষণ ধরে মাথায় একটা ছড়া ঘুরপাক খাচ্ছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই কয়েকটা চরণ মিলে গেলো। –
আমার জন্য কেউ দাঁড়ায় না।
এখন সে আর পথ হারায় না।
আমি একা হতাশার মোড়ে।
বৃষ্টিতে ভিজে গেলো আমার গা।
ঠান্ডায় পানি হলো গরম চা।
আসবে সে কোন পথ ধরে?
আজকে লাইব্রেরিতে তেমন ভিড় নেই। মনটাকে একটু স্থির করে রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' নাটকের বইটা হাতে নিলাম। নাটকের গভীরে ডুব দিতেই প্রিয় লাইব্রেরি টা আমার কাছে একটা কারাগার মনে হতে লাগলো। নাটকে বাইরের প্রকৃতির উদাত্ত আহ্বানে বন্ধ ঘরে রোগাক্রান্ত অমল যেমন ছটফট করে, তেমনি বাইরের বৃষ্টির শব্দ শুনে আমার মনটা ফাঁসির কয়েদির মতো ছটফট করতে লাগলো। ঠান্ডা বাতাসে মাটির সেই নোনা গন্ধটা ভেসে আসছে। বইটা রেখে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। ভেজা ঘাসফুল গুলো দেখতে কি দারুণ লাগছে! চারদিকে মেঘ থমথম করছে। বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমেছে, তবুও রুমঝুম শব্দে মনটা নেচে নেচে উঠছে। ঐ যে দূরে কয়েকটা ছেলে ভিজে ভিজে ফুটবল খেলছে। কি এক উল্লাসে মেতেছে তাঁরা! ফুটবল খেলা দেখলেই পা দুটো কেমন অস্থির লাগে। বকুল গাছটার ডালে একটা কুটুম পাখি ডাকছে। ছাতাটা খুলে আবারও বেরিয়ে পড়লাম।
লেখক,
মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।