বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘায়িত মানবিক বিপর্যয় ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

অনলাইন ডেস্ক ২১ June ২০২৬ · Sunday · ০৫:৫৭ অপরাহ্ণ
রোহিঙ্গা সংকট: দীর্ঘায়িত মানবিক বিপর্যয় ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

 

ফারিহা তাবাসসুম মাওয়া

রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম মানবিক ও রাজনৈতিক অমীমাংসিত, দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকট। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মুসলমানদের ওপর জাতিগত নিধন সংঘটিত হলে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান  বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে মানবিক দরজা খুলে দিলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলাদেশের বারবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ চাপ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সীমান্ত সংঘর্ষ রোহিঙ্গা সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৬ সালেও এই সংকট শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, অমীমাংসিত মানবিক বিপর্যয়।

 

দীর্ঘমেয়াদি মানবিক বিপর্যয় ও অভ্যন্তরীণ চাপ:

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বিশ্ব মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তা সরকার কর্তৃক সৃষ্ট এক বিশাল মানবিক সংকট প্রত্যক্ষ করে। ২০১৯ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সহযোগিতায় ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’ বা যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা চালু করেন।

রোহিঙ্গা সংকট প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থসাহায্য পায়। বিশ্বের বহু দেশ রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থসাহায্য দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করে। কিন্তু পরবর্তীতে ফিলিস্তিন, ইউক্রেন ও ইরানসহ বিশ্বের নানা সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যু ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। ফলে বৈশ্বিক অর্থসাহায্যের পরিমাণও কমতে থাকে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভরণপোষণকে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য করে তুলেছে।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এখনো প্রায় ১.২ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরনার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ শতাংশ। ০–১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫২ শতাংশ, যাদের একটি বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছে এবং সুপেয় পানির অভাবে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।ক্যাম্পগুলোতে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই; একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার কোনো আনুষ্ঠানিক বন্দোবস্তও নেই। ফলে তারা ধীরে ধীরে এক অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।এছাড়া ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রায় ২৬ শতাংশ নারী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছে। তারাও নানামুখী স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সময়ে তারা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের কিছু অংশ মাদক চোরাচালান ও মানবপাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দিন দিন হুমকির মুখে ফেলছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, শ্রমবাজার ও অবকাঠামোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

 

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ:

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকেই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত এবং সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সময়কালে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কিছুটা আশার আলো জাগিয়েছিল। সংকট সমাধানের লক্ষ্যে তিনি সাত দফা দাবি উপস্থাপন করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল— নিরাপদ প্রত্যাবাসন, সহিংসতা বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ, রাখাইনে আন্তর্জাতিক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি, তহবিল সহায়তা, জবাবদিহি ও বিচার নিশ্চিতকরণ এবং অবৈধ বাণিজ্য নির্মূল।

বর্তমান সরকারও রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জোরালো ভূমিকা পালন করছে। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১৮ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ইকোসক হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স সেগমেন্টের উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আলোর মুখ না দেখার অন্যতম কারণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি। মিয়ানমারের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার এবং রাখাইনের প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে আঞ্চলিক ও পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারকে চাপ দেওয়ার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ভেটো প্রদানের  কারণে তা কার্যকর সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তবে চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকবার ‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর আওতায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাখাইন রাজ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

২০১৯ সালে আফ্রিকার ছোট মুসলিম দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যার মামলা দায়ের করে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক  আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করে এবং ২০২২ সালে মিয়ানমার প্রাথমিক আপত্তি জানালে তাও আদালত খারিজ করে দেয় এবং মামলাটি নতুন মাত্রা লাভ করে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রায় ঘোষণার লক্ষ্যে পর্যালোচনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই রায় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মিয়ানমারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি করতে পারে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ফারিহা তাবাসসুম মাওয়া

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিশো...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ১১:০৮ অপরাহ্ণ
নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ০১:২০ অপরাহ্ণ
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুরে সৌদি প্রাসীর বাড়িতে ডাকাতি, আটক ৩

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুরে সৌদি প্রাসীর বাড়িতে ডাকাতি, আটক ৩

নোয়াখালী প্রতিনিধি: কোম্পানীগঞ্জে সৌদি প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সন...

৩১ August ২০২৬ · Monday · ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পরিচয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাকে গাড়িতে তুলে ১২ লাখ টাকা ছিনতাই

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পরিচয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাকে গাড়িতে তুলে ১২ লাখ টাকা ছিনতাই

নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে একটি বেসরকারি ব্য...

৩১ August ২০২৬ · Monday · ০৯:০৭ অপরাহ্ণ