তিন ভাই তিন দলে, রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগ করিমগঞ্জে
জামাল উদ্দিন, , স্টাফ রিপোর্টার :
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলায় তিন সহোদর তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতার পালাবদল হলেও পরিবারটির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব কখনো কমেনি। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
উপজেলা সদরের চরপাড়া গ্রামের এই পরিবারের বড় ছেলে মোশাররফ হোসেন করিমগঞ্জ উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক, মেজো ভাই মোবারক হোসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ছোট ভাই মিজানুর রহমান মিজান করিমগঞ্জ পৌর যুবলীগের সভাপতি।
স্থানীয়দের একাংশ বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখলেও অনেকে এটিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদের বিরল উদাহরণ বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের দাবি, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান নেওয়ার কারণে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, পরিবারটির প্রভাব অক্ষুণ্ন থেকেছে।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা ফরিদ মিয়া বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উপজেলার শত শত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। কিন্তু যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। আমার ধারণা, তাঁর দুই ভাই যুবদল ও এনসিপির নেতা হওয়ায় তিনি এ সুবিধা পেয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেন পেশায় আইনজীবী এবং ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জ জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এনসিপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর মোবারক হোসেনের প্রভাব প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও বিস্তৃত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপিপন্থী এক আইনজীবী দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোবারক হোসেনের প্রভাবের কারণেই মোশাররফ হোসেন পিপি পদে নিয়োগ পান। যদিও জেলা বিএনপি থেকে পাঠানো তালিকায় তাঁর নাম ছিল না।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ও জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, “তিন ভাই তিন দলের রাজনীতি করেন—এ বিষয়টি সবারই জানা। পিপি নিয়োগের জন্য বিএনপি যে তালিকা পাঠিয়েছিল, সেখানে মোশাররফ হোসেনের নাম ছিল না। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপির তালিকা থেকে কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের প্রয়াত বাবা জহিরুল হক মেম্বার বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও তাঁর কোনো দলীয় পদ-পদবি ছিল না, তবুও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা তিন ভাই হলেও প্রত্যেকেই স্বাধীনভাবে রাজনীতি করি। ভাইদের রাজনৈতিক বিষয়ে আমি পরামর্শ দিয়েছি, তবে তারা নিজ নিজ সিদ্ধান্তে চলেছে।” পিপি পদে নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মোবারকের প্রভাবে নয়, নিজের প্রচেষ্টা ও তদবিরের মাধ্যমেই আমি নিয়োগ পেয়েছি। এ বিষয়ে আমি আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।
যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান মিজান বলেন, “প্রত্যেক নাগরিকের নিজের পছন্দমতো রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। আমি আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাস করি বলেই যুবলীগের নেতৃত্বে আছি।” বড় ভাইয়ের কারণে তিনি মামলার বাইরে রয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিনশেষে আমরা ভাই। ভাইয়ের অবদান থাকলে তা অস্বীকার করব না।
এদিকে এনসিপি নেতা মোবারক হোসেনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর যুবদল নেতা মোশাররফ হোসেন আবারও এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর এই প্রভাবের সুবিধা পাচ্ছেন যুবলীগ ও এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তাঁর দুই ভাইও। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে তারা দাবি করেন।