বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

বিপ্লবের অমলিন স্মৃতির নাম জুলাই

অনলাইন ডেস্ক ০৫ August ২০২৬ · Wednesday · ০৭:১৩ অপরাহ্ণ
বিপ্লবের অমলিন স্মৃতির নাম জুলাই

'জুলাই '-ক্যালেন্ডারের একটি মাস। কিন্ত আমাদের স্মৃতিতে এটি শুধুমাত্র একটি মাস নয়;এটি সাহস,প্রতিবাদ,আত্মত্যাগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্খার প্রতীক। জুলাই আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে বাকস্বাধীনতা। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সকল শহীদের প্রতি। আন্দোলনের সময়ে বিপ্লবী বন্ধুদের সাথে স্বকন্ঠে  সমস্বরে  জানিয়েছি  প্রতিবাদ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমনি কয়েকজন বিপ্লবী বন্ধুর জুলাই স্মৃতি তুলে ধরছি আমি নওশিন শারমিলি, শিক্ষার্থী, আল ফিকহ এন্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

জুলাইয়ের স্মৃতিচারণ: সাহস, ত্যাগ ও জয়ের স্মৃতি

২০২৪ সালের জুলাই আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একজন নারী শিক্ষার্থী হিসেবে আমি রাজপথে নেমেছিলাম। সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্লকেড কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছি প্রতিবাদের ভাষা। চোখের সামনে নিরস্ত্র মানুষের রক্ত ঝরতে দেখেছি, মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখেছি যে প্রতিটি মুহূর্তে বুক কেঁপে উঠেছে। ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল, পরিবারকে হারানোর শঙ্কা ছিল—তবুও পিছু হটিনি। কারণ বিশ্বাস ছিল, ন্যায়ের পথে দাঁড়ানোর চেয়ে বড় সাহস আর নেই। সেই জুলাই আমাকে শিখিয়েছে, ভয়কে জয় করেই ইতিহাস লেখা যায়। আজও সেই রক্তাক্ত দিনগুলোর স্মৃতি হৃদয়ে অমলিন। শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের ত্যাগ ও অসংখ্য মানুষের সাহস আমাদের দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। জুলাই কেবল একটি মাস নয়, এটি আমার কাছে সাহস, আত্মত্যাগ ও বিজয়ের এক চিরন্তন প্রতীক।

রুবাইয়া 

শিক্ষার্থী, আল ফিকহ এন্ড ল বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। 

 

হাজার বছরের ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন

পৃথিবীর ইতিহাসে আন্দোলন-সংগ্রামের শেষ নেই। জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিরোধ যুগে যুগে ঘটেছে, কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিধিতে এমন কোনো আন্দোলনের ইতিহাস জানা নেই, যা ক্যালেন্ডারের তারিখকেই বদলে দিয়েছে। অথচ ‘৩৬ জুলাই’ আজ একটি প্রতীকী তারিখ বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের অবিস্মরণীয় স্মারক। দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিজয়ের অপেক্ষা যেন গিয়ে ঠেকেছিল এই ‘৩৬ জুলাই’-এ। সেই আন্দোলনের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে প্রতিটি দিনই আমার কাছে স্মৃতিময়। একদিন কর্মসূচিতে অংশ নিতে বড় ভাই আমির ফয়সালকে সঙ্গে নিয়ে কুষ্টিয়ায় যাই। চৌড়হাস মোড়ে পৌঁছে দেখি, সরকারের মোতায়েন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান।পরিস্থিতি বুঝে কোর্ট চত্বরের দিকে গেলেও সেখানেও একই দৃশ্য। পরে মজমপুর মোড়ে অবস্থানকালে বন্ধু সুলতানসহ কয়েকজন সহযোদ্ধার ফোন আসে, পুলিশ তাদের ঘিরে ফেলেছে। দূরে অবস্থানরত বড় ভাইদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। আমরা অনেককে দ্রুত সরে যেতে বললেও কয়েকজন সহযোদ্ধা গ্রেপ্তার হন। কিছুক্ষণ পর আমরাও নিরাপত্তা বাহিনীর নজরে পড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস বাঁচতে গিয়েই অজান্তে র‍্যাবের গলিতে ঢুকে পড়ি। তখনই মনে পড়েছিল ,যেখানে বাঘের ভয় ,সেখানেই সন্ধ্যা হয় ।

আব্দুল্লাহ আল নোমান 

শিক্ষার্থী, আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। 

 

বাংলার জুলাই: একটি সাধারণ জাতির অসাধারণ ইতিহাস

একটি সাধারণ জাতির মাঝেও শহীদ আবু সাঈদের মতো কিছু সন্তানের প্রয়োজন হয়, যারা দেশের ক্রান্তিলগ্নে হায়নার সামনে বুক চিতিয়ে, দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। আজ "জুলাই" শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সহস্র মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা; লেখা আছে দেশের জন্য হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণের ইতিহাস। এই যমিন আজ তাঁদের রক্তে উর্বর। আন্দোলনের একটি পর্যায়ে মনে হয়েছিল—হয়তো আর ফেরা হবে না। কিন্তু এই শহীদ ও গাজীরাই আমাদের নতুনভাবে কথা বলতে শিখিয়েছেন, শিখিয়েছেন সাহসী হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে এবং আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে। তাই আজ শহীদ ওসমান হাদীর মতোই বলতে ইচ্ছা হয়— “জান দেব, জুলাই দেব না।”

ত্বকী ওয়াসীফ

শিক্ষার্থী,,অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

 

জুলাই আন্দোলনে নারী ছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা কোটা সংস্কার আন্দোলন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমাদের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও ২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরু থেকেই ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই ২০২৪ থেকে আন্দোলন শুরু করে। এরপর ৪ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত না করায় কার্যত ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনটি অকার্যকর হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং আন্দোলন আরও জোরালো রূপ নেয়।এই প্রেক্ষাপটে আমি প্রথম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি ৫ জুলাই ২০২৪। সেদিন সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা "বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন" ব্যানারে একযোগে অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত। ৬ জুলাই থেকে আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকে। আমরা বিভিন্ন স্লোগান যেমন- "আপোষ না সংগ্রাম,সংগ্রাম সংগ্রাম", " আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই" 

ইত্যাদি দিতে দিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শেখপাড়া বাজার পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ও র‍্যালি করি। আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও উদ্দীপনা লক্ষণীয় ছিলো। এরপর ৭ জুলাই থেকে আমরা ধারাবাহিকভাবে "বাংলা ব্লকেড"  কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি এবং কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করি। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে থাকে। ১১ জুলাই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল। সেদিন সারাদেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ারশেল ও গুলি চালানোর ঘটনার প্রতিবাদে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ও উত্তাল হয়ে ওঠে। প্রধান ফটকে কঠোর পুলিশি অবস্থান থাকা সত্ত্বেও আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাই। পরবর্তীতে এই দিনটির সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্মরণে ১১ জুলাইকে "গণঅভ্যুত্থানে প্রথম প্রতিরোধ দিবস" হিসেবে ঘোষণা করা হয়। 

এই আন্দোলনে মেয়েদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে। মিছিল, সড়ক অবরোধ, অবস্থান কর্মসূচি, স্লোগান, সমাবেশ—সব ক্ষেত্রেই মেয়েদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। অনেক সময় মেয়েরাই সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছে এবং অন্যদের সাহস জুগিয়েছে।মেয়েদের জন্য এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ সহজ ছিল না। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারিবারিক বাধা, সামাজিক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব ছিল বড় প্রতিবন্ধকতা। তবুও তারা সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই আন্দোলন আমাকে শিখিয়েছে যে ঐক্য, সাহস এবং ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সুমাইয়া জেসমিন

শিক্ষার্থী, পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ