মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

প্রতিবাদের শহীদ মিনার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে: নোবিপ্রবির তিন শিক্ষকের যাত্রা

অনলাইন ডেস্ক ০১ August ২০২৬ · Saturday · ০৫:৪৩ অপরাহ্ণ
প্রতিবাদের শহীদ মিনার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে: নোবিপ্রবির তিন শিক্ষকের যাত্রা

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি:

দুই বছর আগের সেই উত্তাল জুলাই। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে, তখন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণও হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের প্রতীক। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির ঘটনার বিরুদ্ধে যখন অধিকাংশ শিক্ষক নীরব ছিলেন, তখন মাত্র তিনজন শিক্ষক প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে নিপীড়নবিরোধী সমাবেশ করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই তিন শিক্ষকই আজ দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁরা হলেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি জানান এবং নিপীড়নের প্রতিবাদে কণ্ঠ মিলিয়েছিলেন।

সেই সময় আন্দোলন ঘিরে দেশে একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ও প্রাণহানির খবর আসছিল বিভিন্ন স্থান থেকে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এই তিন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের ভাষায়, এটি ছিল একজন শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব পালন।

দুই বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁদের তিনজনই এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বে রয়েছেন। আন্দোলনের পর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ প্রথমে নোবিপ্রবির ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন।

সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ মুরাদ বলেন, ঐসময় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে গিয়েছিল , এক পর্যায়ে তারা সব শিক্ষকদের মেইল করে অনুরোধ করে ওদের সাথে থাকার জন্য। আমরাও আগে থেকে প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম এরপর ওদের মেইল পেয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেই আমরাও ওদের সাথে গিয়ে আন্দোলনে একাত্মতা পোষণ করবো। বিশেষ করে আমি, জাহাঙ্গীর স্যার, শফিক স্যার আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেই। 

তিনি আরও বলেন , তখন আমরা কোনো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় আন্দোলনে নামিনি। আমার অনুভূতি ছিলো আমরা তো শিক্ষক আমাদের ছাত্রদের উপর নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। 

তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে ক্লাসে থাকা যতটা ইম্পর্ট্যান্ট, যৌক্তিক আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা মারা যাচ্ছে তখন তাদের পাশে থাকা আরো বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। এতে আমরা চাকরিচ্যুত হওয়া, এরেস্ট হওয়া এবং মেরেও ফেলতে পারতো এগুলো নিয়ে চিন্তা না করে আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে দাড়াই।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা শহিদ মিনারের সামনে দাড়িয়েছি যখন দেখেছি আমাদের ছাত্রদের দাবি ন্যায্য, তারা যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছিলো তখন তাদের উপর গুলি ছোড়া হচ্ছিলো, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছিলো। বিশেষ করে আবু সাঈদকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয় তখন আমরা ছাত্রদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করি। ঐসময় এই চিন্তা করিনি আমাদের চাকরি চলে যাবে আমাদের ক্ষতি হবে বা এরকম কিছু। 

তিনি জানান, আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনে রাজপথে ছিলাম। আমাদের ১৯৭১ এ জন্ম হয়নি দেখে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, আমার জীবদ্দশায় ভবিষ্যতে আবার যদি কখনো দাড়াতে হয় দেশের জন্য আবারো দাড়াবো, ইনশাআল্লাহ।

অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর সরকার বলেন, আমি আন্দোলন করেছি একটি বৈষম্যবিরোধী সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, প্রত্যেকে প্রত্যেকের অধিকার ফিরে পাক। এর জন্য যে আমাকে কিছু পেতে হবে তাই আন্দোলন করিনি। ছাত্র সমাজের উপর হামলা, সারাদেশে গুম, খুন, হত্যা এর প্রতিবাদে ঐ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি। 

তিনি বলেন, আমি একটি বিষয় ধারণ করি; আজকের ছাত্র আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এজন্য আমার দায়িত্বের জায়গা থেকে যতটুকু করার আমি করি। দায়িত্ব পেয়েছি এজন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, সরকারকেও ধন্যবাদ। দায়িত্ব পাওয়াই বড় কথা নয় এই দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে পারাই মূল বিষয়।

দুই বছরের ব্যবধানে নোবিপ্রবির শহীদ মিনারের সেই ছোট্ট প্রতিবাদ আজ ইতিহাসের একটি অধ্যায় হয়ে আছে। সেই সমাবেশে উপস্থিত তিন শিক্ষক এখন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের অংশ। তাঁদের এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং সংকটময় সময়ে নৈতিক অবস্থান, শিক্ষকের সামাজিক দায়িত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ